সর্বশেষ সংবাদ

টিভি নাটকে কী নেই?

 

মানসম্পন্ন টেলিভিশন নাটকের প্রসঙ্গ আসলেই ঘুরে-ফিরে শোনা যায় অতীতের গল্প, যখন চ্যানেল বলতে ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। প্রতি সপ্তাহে প্রচার হত একটি খণ্ড নাটক ও ধারাবাহিক নাটকের একটি পর্ব। বর্তমানে চ্যানেল সংখ্যা ২৬ হলেও সন্তুষ্ট নন দর্শক-সমালোচক কেউই। কেন?


এই প্রশ্ন নিয়ে মিডিয়া জগতের বেশ কিছু মানুষের মুখোমুখি হয় পরিবর্তন ডটকম। তাদের মুখে উঠে এসেছে ভাল চিত্রনাট্য, নির্মাতা, বাজেট, সম্বন্বয়হীনতা ও পেশাদারিত্ব না থাকার কথা। তারা আরো জানান— নাটক চলে গেছে চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগের হাতে, নির্মাণে নেই নির্মাতাদের স্বাধীনতা।

আগের মত নাটক জনপ্রিয় হয় না কেন? এমন প্রশ্নে মাছরাঙার টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক এএম আরিফুর রহমান বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি অভাব ভাল গল্পের, ভাল চিত্রনাট্যের। আরো কিছু সমস্যা আছে। যেমন; আমাদের বাজেট কম, আর্টিস্টসহ সবার মধ্যে কম-বেশি পেশাদারিত্বের ঘাটতি আছে। সময় স্বল্পতার কারণে নির্মাতাদের উপর চাপও বেশি থাকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নাটক থেকে আয় করার সুযোগ কম। তাই ব্যয় করার সুযোগও কম। আমরা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শুধু আয় করি। কেবল অপারেটর বা অন্য কোথাও থেকে টাকা পাই না। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে গুণী নির্মাতারা ভাল নাটক উপহার দিতে পারবেন।’
শূন্য দশক থেকেই বাড়তে শুরু করেছে চ্যানেলের সংখ্যা। সে অনুযায়ী বাড়ে নাটক। সেই জোয়ারে ভাসতে ভাসতে এখন ২০১৬ সাল। যত দিন যাচ্ছে বাড়ছে সমস্যা। অনেকের মতে, নাটক সংশ্লিষ্টরা কাজের প্রতি মনোযোগী নন। অভিনেতা জাহিদ হাসান বললেন, ‘এখন যারা অভিনয় করছে তাদের মাঝে সিরিয়াসনেস কম দেখি। আমি যেহেতু পরিচালনাও করি, অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। আর্টিস্টদের দেখি কাজের চেয়ে ফোনে চ্যাটিং করতেই বেশি পছন্দ করেন।’

সম্বন্বয়হীনতার প্রতি জোর দিলেন অভিনেতা আজাদ আবুল কালাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনকার বাংলা নাটক নানা সমস্যায় জর্জরিত। নাটক শুরু হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় নানান ধরনের বিজ্ঞাপন। প্রধান সমস্যাটা হল নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, চ্যানেল— কারো সাথে কারো সঠিক সমন্বয় নেই। সবার চেষ্টা কীভাবে বেশি লাভ করা যায়। যারা এখানে পেশাদার তাদের সবসময় লড়াই করতে হয়। বেঁচে থাকার জন্যই নামতে হয় অসুস্থ প্রতিযোগিতায়।’

চলতি বছর প্রথমবারের ডিরেক্টর গিল্ডস নির্বাচন হয়েছে। পরিচালকদের সংগঠনটি বাংলা নাটককে এগিয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। গিল্ডস সভাপতি গাজী রাকায়েত বলেন, ‘আমরা এখন দায়সারাভাবে নাটক বানাচ্ছি। ডিটেইলিং কমে যাচ্ছে। মান কমার জন্য প্রথমত আমি চিত্রনাট্যকে দায়ী করব। এ ছাড়া বাজেট কমে যাওয়ায় ডিটেইলস গল্প দেখানো হয়তো সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘নাটকে ঠিকমত সমন্বয় হচ্ছে না। মেধা আছে কিন্তু সঠিক মূল্যায়ন নেই। সংস্কৃতি আসলে পণ্য হতে পারে না। কিন্তু টেলিভিশন মাধ্যমে সংস্কৃতিকে পণ্য হিসেবে চিন্তা করা হচ্ছে। এখন আমরা সবাই যার যার মত কাজ করছি। এই অগোছালো অবস্থা থেকে বের হতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’
সময় ও কৌশলগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন প্রবীণ অভিনেতা তারিক আনাম খান। তিনি বলেন, ‘আগে নাটক কম ছিল। চ্যানেল বলতে ছিল বিটিভি। আগের নাটকে অনেক কিছুই ছিল। এই কারণে দর্শক সপ্তাহব্যাপী পথ চেয়ে থাকত। এখনকার সমস্যা হল নাটক চলে গেছে টেলিভিশনের মার্কেটিং বিভাগের কাছে। তারা নির্ধারণ করে কোনটা যাবে, কোনটা যাবে না। মানতেই হবে আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তিনদিনের কাজ করতে হয় একদিনে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তারপরও এখনো মাঝে মধ্যেই এমন কিছু গল্প আসে দুই লাইন শুনেই মুগ্ধ হয়ে যায়।’

নাটকের এসব সমস্যার সমাধান কী হতে পারে? এ প্রসঙ্গে অভিনেতা-নির্মাতা তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা বলে আসছি— নাটকের মান হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা কম টাকা পাচ্ছি। আবার টিভি চ্যানেল অনেক হওয়ায় নাটকও বেশি হচ্ছে। আমি বলব, তাহলে কি আমাদের এতগুলো চ্যানেল করার সিদ্ধান্তটি আত্মঘাতী ছিল না। মেনে নিলাম ভুল ছিল। এখন কী হবে? আমার মনে হয় কিছু নীতিমালা দরকার। নির্মাতা, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, টিভি চ্যানেল, এজেন্সি, বিজ্ঞাপনদাতা সবার সমন্বয়েই এই নীতিমালা তৈরি করলে কিছুটা সমাধান হবে।’

ফিরে দেখা : ঢাকার প্রথম টিভি নাটক মুনীর চৌধুরী রচিত ও মনিরুল আলম প্রযোজিত ‘একতলা দোতলা’। ৩০ মিনিটের নাটকটির জন্য টানা একমাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহড়া হয়েছিল। ১৯৬৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নাটকটি অত্যন্ত সফলভাবে ডিআইটি স্টুডিও থেকে সরাসরি সম্প্রচার হয়। এর কিছুদিনের মধ্যে নাটক সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। ওই সময়ের জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে ছিল ত্রিরত্ম, ঘরোয়া, আমাদের মাসুম, নতুন বাড়ি, দম্পতি, সত্যিই সেলুকাস, নাইটগার্ড, সামনের মাসে, আরেক ফাল্গুন, কতগুলো মৃত্যু, বিষুবরেখা, যখন চেতনা, কুশল সংবাদ, মুখরা রমণী বশীকরণ প্রভৃতি।

আশির দশকে জনপ্রিয় নাটকের মধ্যে ছিল সৈয়দ শামসুল হকের ‘কবি’, সেলিম আল দীনের ‘দেবদূত’, ‘একদিন একরাত্রি’, আমজাদ হোসেনের ‘অস্থির পাখিরা’, মামুনুর রশীদের ‘এখানে নোঙর’, মমতাজউদ্দিন আহমদের ‘হরিণ চিতা চিল’, সেলিনা হোসেনের ‘চাঁদবেনে’ ও হুমায়ূন আহমেদের ‘প্রথম প্রহর’। খণ্ড নাটকের পাশাপাশি জনপ্রিয়তা পায় সিরিয়াল। ধারাবাহিক নাটক রচনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বেগম মমতাজ হোসেন। তার ‘সকাল সন্ধ্যা’ তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে চার বছর প্রচার হয়। অন্যান্য জনপ্রিয় ধারাবাহিকের মধ্যে রয়েছে এইসব দিনরাত্রি, পূর্ব রাত্রি পূর্ব দিন, সংশপ্তক, জোনাকী জ্বলে, ঢাকায় থাকি, বহুব্রীহি ও কোথাও কেউ নেই।

নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশন মিডিয়ায় ঘটে যায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বিটিভির বাইরের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মিত হতে থাকে প্যাকেজ নাটক। ১৯৯৫ সালে প্রচারিত হয় প্রথম প্যাকেজ নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’। কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানা সিরিজ অবলম্বনে নাটকটি নির্মাণ করেন আতিকুল হক চৌধুরী। অভিনয় করেন বিপাশা ও নোবেল।  এরপর সাটেলাইট চ্যানেলের আবির্ভাবে প্যাকেজ নাটকের রমরমা বাজার গড়ে উঠে। বাড়তে থাকে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, নাট্যকার, অভিনয়শিল্পী ও অন্যান্য কলাকুশলী।



No comments:

Post a Comment

Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.