'প্রথম প্রেমের মতো, প্রথম কবিতা এসে বলে, হাত ধরে নিয়ে চলো, অনেক দূরের দেশে...।' এমন কাব্যকথায় সাজানো ফেরদৌস নাহারের লেখা গানটি সুর করেছিলাম আমি। মাইলসের (miles) প্রথম বাংলা অ্যালবাম 'প্রতিশ্রুতি'র জন্য এটি রেকর্ড করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল অ্যালবামটি। এ কথা কমবেশি সবাই জানেন।
যেটা অনেকেই জানেন না, সে কথা বলি। ফেরদৌস নাহারের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অমার মা কিংবদন্তি নজরুল সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজা বেগম। ১৯৮৯-এর ডিসেম্বরে ফেরদৌস নাহার কলকাতায় গিয়েছিলেন একটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। দমদম এয়ারপোর্টে মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার। একই বিমানে দু'জন সফর করেছিলেন। ফেরদৌস নাহারের কাছেই পরে শুনেছি সেই সফরের গল্প। সে গল্প এভাবেই শুনিয়েছিলেন, 'লাগেজের জন্য আমি যখন অপেক্ষা করছিলাম, তখন ফিরোজা বেগমের মতো কিংবদন্তি শিল্পী ছিলেন আমার একেবারে পাশে। এমন আপন স্বরে আমার সঙ্গে কথা বললেন যেন, আমি তার অনেক দিনের চেনা। বিস্মিত হয়েছিলাম, এত বড় মাপের শিল্পীকে পাশে দাঁড়িয়ে আপনজনের মতো কথা বলতে দেখে। যিনি এত সহজেই আপন করে নিতে জানেন, তার সঙ্গে কথা না বলে কী থাকা যায়। যায় না বলেই সে যাত্রায় আমরা প্রাণ খুলে কথা বলেছিলাম। প্রিয় শিল্পী ফিরোজা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, কবিতা লেখো, গান লেখো না? বলেছিলাম- কিছু কিছু, তবে সেগুলো গান হয় কি-না জানি না। এর পর তিনি আমার ফোন নম্বর রেখেছিলেন। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও আপন করে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশে ফিরে যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। এত বড় শিল্পী, তার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করব- ভেবে পাইনি। কিন্তু আমি যোগাযোগ না করলে কী হবে, তিনি নিজেই সত্যি সত্যি একদিন আমাকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন বাসায় যেতে। আরও বলেছিলেন, আমার গানের খাতা নিয়ে যেতে যেন না ভুলি। এই আমন্ত্রণ পেয়ে তার বাসায় গিয়েছিলাম।'
তারপর কী হয়েছিল, সে ঘটনা এবার আমি বলি- মা ফেরদৌস নাহারের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি আমাকে তার গানের খাতা এগিয়ে দিয়েছিলেন। তার কাব্যিক লিরিক পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, মাইলসের অ্যালবামে তার লেখা গান
রাখব। একটি নয়, দুটি গান নির্বাচন করেছিলাম। এর পরই গানে সুর করতে বসে গিয়েছিলাম। গানের কথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সফট রোমান্টিক আমেজে গানটি করা হয়েছিল। ব্যান্ডের সবাই গানটি পছন্দ করেছিল। তারপরও অনুমান করতে পারিনি, এই গান এত মানুষের প্রিয় গানে পরিণত হবে। অবাক লাগে এটা দেখে যে, ১৬ বছর পরও এই গান আজও সমান জনপ্রিয়। তাই কমবেশি সব আয়োজনেই এটি গাইতে হয়। শ্রোতারা হয়তো এই গানে প্রথম প্রেমের আমেজ খুঁজে পান, নইলে এত বছর পরও এর জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি? এর উত্তর অবশ্য শ্রোতারাই ভালো দিতে পারবেন। আমাদের ভালোলাগা এটাই যে, মাইলসের এই গান একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে। এ জন্য ঠিক করেছি, শ্রোতারা যখনই কোনো আয়োজনে এই গান শোনার আবদার করবেন, চেষ্টা করব তাদের এই আবদার পূরণ করতে। গাইব প্রাণ খুলে।


No comments:
Post a Comment