সর্বশেষ সংবাদ

ববিতার তো প্রেম ছিল জাফর ইকবালের সঙ্গে

 
I-was-in-love-with-Babita-Zafar-Iqbal

 এখনো ‘মিয়াভাই’ বললে যার চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠে তিনি নায়ক ফারুক ছাড়া আর কেউ নন। আকবর হোসেন পাঠান দুলু তার আসল নাম হলেও চলচ্চিত্রের কল্যাণে তা চাপা পড়েছে অতল গহ্বরে! সবাই তাকে চিনেন ফারুক নামেই। এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ চলচ্চিত্র দিয়ে তার রুপালি পর্দায় অভিষেক। ৭০ ও ৮০’র দশকের প্রায় সব নায়িকার সঙ্গে তিনি অভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে কবরী, শাবানা, ববিতা, রোজিনা, অঞ্জনা, সুচরিতা, অঞ্জু ঘোষ, চম্পা, রানী উল্লেখযোগ্য। তবে এ জুটির রাজ্যে ববিতা-ফারুক দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে। চলচ্চিত্র অন্তপ্রাণ হলেও ফারুকের জীবনে রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একান্ত আলাপচারিতায় উঠেছে ফারুক সমগ্র! সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হল-




আপনি যখন চলচ্চিত্রে আসেন তার আগেই রাজ্জাক-আনোয়ার হোসেন-আলমগীরদের রাজত্ব চলছিল, আপনার আগমনে অন্যরা কেমন উৎসাহ দিয়েছিলেন?
উৎসাহ দিতেন। আমি এফডিসিতে ঢুকতে ভয় পেতাম। ভাবতাম ওইখানে এতো বড় বড় আর্টিস্ট আছেন, আমি সেখানে অভিনয় করতে পারব না। দুলু হিসেবে এফডিসি কেন, পৃথিবীর কোথাও যেতে আমার ভয় নেই, কিন্তু যখন আমি ফারুক তখনই আমার ভেতরে একটা ভয় কাজ করত। একদিন যাওয়ার পর রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল। সেখানে আমার বড় ভাইয়ের এক বন্ধু ছিলেন, তিনি আবার রাজ্জাক ভাইয়েরও বন্ধু। উনি আমাকে রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। রাজ্জাক ভাই আমাকে তার পাশে বসালেন, বললেন আমি দোয়া করি ভাই তুমি ভালো কাজ কর।

লাঠিয়াল চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এরপরে অসংখ্য ভালো  চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেও জাতীয় পুরস্কার না পাওয়াটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ওই যে বললাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি বলে আমার ক্যারিয়ার ধ্বংসের জন্য কুচক্রী মহল সদা সচেষ্ট থাকত। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগও আমাকে মূল্যায়ন করেনি বরং প্রতিটা কাজে বাধা দিয়েছে।

জুটি হিসেবে ববিতা-ফারুক ছিল দর্শকদের সবচেয়ে পছন্দের। ববিতাকে নিয়ে কোনো মজার স্মৃতি মনে আছে?
স্মৃতি মানেই মজার। সে হিসেবে আলাদা কিছু বলার নেই, সবই মজার স্মৃতি। মজা লাগত মানুষ যখন বলত ফারুক-ববিতার তো সিরিয়াস প্রেম, তারা তো বিয়ে করে ফেলবে। আমার জানা মতে ববিতার তো প্রেম ছিল আমার বন্ধু জাফর ইকবালের সঙ্গে। আরো অনেকের সঙ্গেই ছিল। আমার সঙ্গে কেবলই সুন্দর একটা বন্ধুত্ব ছিল। এই বন্ধুত্বকে কেউ যদি প্রেম বলে, আমি তাতে মাইন্ড করব না। এত সুন্দর বন্ধুত্ব ছিল, এটাকে প্রেম বলা যায়েজ। কাজ করতে গেলে অটোমেটিক্যালি একটা উইকনেস গ্রো করে।

প্রফেশনাল জেলাসি নিশ্চয় আপনাদের সময়তেও ছিল। এ রকম কোনো ঘটনার কথা মনে পড়ে?
প্রফেশনাল জেলাসি তো সাংঘাতিক ছিল, কিন্তু আমাদের মাঝে কোনো নোংরামি ছিল না। আমি কখনও এইসব জেলাসি করিনি। রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রচণ্ড ভালো সম্পর্ক থাকার পরও আমার কেন যেন মনে হত তিনি এই প্রফেশনাল জেলাসিটা বেশি করতেন। আবার তিনি যে আমাকে ভালোবাসতেন বা স্নেহ করতেন সেটা নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আপনি ‘মিয়া ভাই’ নামে অধিক পরিচিত। কেমন লাগে কেউ এই নামে ডাকলে?
লাঠিয়াল ছবিটা করার পর থেকে এই নামটার সূচনা হয়েছিল। লাঠিয়ালে আনোয়ার হোসেনকে আমি মিয়া ভাই ডাকতাম। আবার আনোয়ার হোসেনও আমাকে মিয়া ভাই ডাকতেন। একটা সিকোয়েন্স ছিল আনোয়ার হোসেন আমাকে লাঠিপেটা করছেন, আমি ‘মিয়া ভাই’ বলে জোরে একটা চিৎকার করি। আমাকে যখন কেউ মিয়া ভাই বলে আমি মনে করি একদম আত্মার আত্মীয়। এই কারণে এই ডাকটা আমার ভীষণ প্রিয়।

দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অসংখ্য ছবি নির্মিত হয়েছে। এসব ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে কি?
মনে হয় না। কিছু কিছু সাবজেক্ট এসেছে তবে সামগ্রিকভাবে আসেনি। অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিতে গোলাগুলিটাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, যুদ্ধের মধ্যে গোলাগুলি তো থাকবেই কিন্তু সেগুলোর বাইরেও অনেক মানবিক দিক ছিল সেই স্টোরিগুলো কেউ তেমনভাবে তুলে আনতে পারেনি। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের উপর ছবি বানিয়েছেন- নারায়ণ দা, আতা ভাই, সুভাষ দা, চাষী ভাই, কুমকুম ভাই। কিন্তু আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের উপর কয়েকশ ছবি হতে পারে। তবে সেটা খুব পরিকল্পিতভাবে করতে হবে এবং গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে। আতা ভাই শেষ ছবিটা বানিয়েছিলেন- ‘এখনও অনেক রাত’। ছবির নামটার মধ্যে অনেক কিছু আছে। অনেক মিনিংফুল। এর অর্থ এখনও ভোর হয়নি, ভোর হতে অনেক দেরি আছে। কীভাবে ভোর হবে গুলশানের হলি আর্টিসানের মতো ঘটনা কিংবা শোলাকিয়ার মতো ঘটনা ঘটালে? আমরা এখনও অন্ধকারে আছি।

বর্তমান চলচ্চিত্রে সঙ্কটগুলো কী বলে মনে করেন? চলচ্চিত্রের পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় বর্তমান চলচ্চিত্রের চেষ্টা আছে। অনেকেই আর্টিস্ট সঙ্কটের কথা বলেন, আমি সেটা মনে করি না। আর্টিস্ট হল কাদামাটি। যে ১০০টা ছবি করেছে তাকেও চাইলে তৈরি করা যাবে যদি তার মধ্যে কোনো ইগো না থাকে। আমাদের তো কিছু কিছু ছেলের ইগো বেশি, তারা পারবে না। নতুনদের নিয়ে এমন কিছু করা যায় যা কল্পনাও করা যায় না। ভালো গল্পের অভাব, আর আমার কাছে মনে হয় আরেকটা বড় বাধা ফাইন্যান্সের অভাব। এগুলোর কারণে চলচ্চিত্র দিন দিন নিম্নমানের হচ্ছে।

বর্তমানে যৌথ প্রযোজনার নামে যে প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে সেটাকে কীভাবে দেখেন?
বর্তমান চলচ্চিত্রের বাজার খারাপ থাকার কারণে একটা পক্ষ যৌথ প্রযোজনার নামে ভারত থেকে যেভাবে ছবি আনছে সেটা একদমই সিস্টেমের বাইরে। এগুলোতে সরকারের নজর দেওয়া উচিৎ। আর সঙ্গে সঙ্গে বেহায়ার মতো এটাও আহ্বান করি আমাদের মতো লোকজনকে ফিল্মের সঙ্গে ইনভলভ করেন। সরকারি অনুদান বাড়াতে হবে। তিন কোটির নিচে অনুদান দিলে ভালো কাজ সম্ভব না। একজন আর্টিস্ট যোগ্য মূল্যায়ন না পেলে ভালো কাজ করতে আগ্রহী হবে না।

আপনাদের সময় অভিনয়ের প্রতি আর্টিস্টদের দায়বদ্ধতা ছিল। এখন আর্টিস্টদের মধ্যে সে ধরনের দায়বদ্ধতা দেখেন কি? 

না দেখি না। তাদের মধ্যে কোনো দায়বদ্ধতাই নেই। এসব বলে লাভ নেই। এগুলো পরিবেশ থেকে তৈরি হয়, সেই পরিবেশটাই বোধহয় নাই। 

দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর ভাবনা কেমন ছিল?
৭ মার্চের বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন- ‘আমি সংস্কৃতির মুক্তি চাই।’ এটার মানে কী? হি ইজ এন আর্টিস্ট। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। এফডিসি তিনি তৈরি করে গেছেন। কালচারাল সেক্টরকে উনি রিচ করে গেছেন।

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমি রাজনীতিবিদ না। বর্তমান রাজনীতি নিয়ে বলতে গেলে বলব সুস্থ রাজনীতির চর্চা উঠে গেছে। এই জন্য প্রধানমন্ত্রী বলেন- ‘মাঠ আমি খালি পেয়েছি, আমার পায়ে বল, আমি গোল দিতেই থাকব’। তার তো কোনো দোষ নেই। ক্ষমতা তো জনগণের হাতে। আপনাদের তো কোনো রাইট নেই জনগণকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যে এই নির্বাচন মানি না, ভোটে যাবো না। তার মানে তাদের জনগণের সম্পৃক্ততা দরকার নেই, এই রাজনীতি ভালো হবে কী করে?



No comments:

Post a Comment

Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.