মাথায় গোলাপি স্কার্ফ আর হলুদাভ রঙের সালোয়ার-কামিজ পরে সোফায় বসে আছেন Shabana। ১৭ বছর আগে অভিনয়কে বিদায় জানানো শাবানা এখনো কোটি বাঙালির হৃদয়ে অভিনয়ের রানি হয়ে বসত গেড়ে আছেন।
অভিনয় ছেড়ে শাবানা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বাসিন্দা। স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে সেখানেই থাকছেন। প্রতিবছর একবার দেশে এলেও জনসমক্ষে আসতেন না। কয়েকটি দিন নিজের মতো করে কাটিয়ে আবার দেশের বাইরে পাড়ি জমাতেন।
এবার এসেছেন এ বছরের এপ্রিলে। ঈদের আগে কয়েক দফা তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। সে সময় তিনি সিনেমা ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেন। তবে দেশের কোনো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সামনাসামনি বসে কথা হয়নি তাঁর। এমনকি একেবারে ঘরোয়া কোনো আয়োজন ছাড়া এই নায়িকার সঙ্গে দেখা হয় না চলচ্চিত্রের মানুষদেরও।
স্বামী ওয়াহিদ সাদিকসহ শাবানা এবার দেশে আসার পর ভাগ্যক্রমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয়। শাবানার স্বামী, বাংলা সিনেমার একসময়ের ডাকসাইটে প্রযোজক ওয়াহিদ সাদিক তাঁদের বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।
১০ জুলাই সন্ধ্যা। ঠিকানা অনুযায়ী চলে গেলাম। নিচে গিয়ে নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে নিশ্চিত হলাম, এখানেই থাকেন শাবানা। দরজায় গিয়ে কলবেল চাপতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন ওয়াহিদ সাদিক। বসার ঘরে ঢুকে দেখা হলো জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে। সোফায় শাবানার মুখোমুখি বসলাম। এরই মধ্যে দুই দফায় ফোনে কথা বললেন। এর মধ্যে একজন অভিনেত্রী আনোয়ারা, অন্যজন অভিনেতা ফেরদৌস। কথা শেষ হলে আড্ডায় মন দেন।
পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন মারফত জানতে পেরেছেন, দেশের সিনেমা এখন খারাপ একটা সময় পার করছে। শাবানা বললেন, ‘এখন নাকি এফডিসিতে সিনেমার শুটিংই হয় না। অথচ আমাদের সময় এই এফডিসিতে শুটিংয়ের জন্য ফ্লোরই পাওয়া যেত না। আর ঈদের সময় তো সিনেমার মানুষদের দম ফেলারই সময় ছিল না। টাকার চেয়ে শিল্পের প্রতি আমাদের ভালোবাসা বেশি কাজ করত।’
ওয়াহিদ সাদিক জানালেন ভাত দে সিনেমা নিয়ে তাঁর মজার অভিজ্ঞতা। বললেন, ‘এই সিনেমার শুটিং করতে মানিকগঞ্জে গিয়েছিলাম। সিনেমার গল্প অনুযায়ী লোকেশনও আমাদের পছন্দ হয়। তারপরও শুটিংয়ের সুবিধার জন্য কয়েক বিঘা জমি কিনে নিই। শুটিং শেষে ঢাকায় ফেরার সময় ওই জমি স্থানীয় ব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দিয়ে আসি।’
আড্ডায় এল আঁখি আলমগীর প্রসঙ্গ। ওয়াহিদ সাদিক বলেন, ‘ভাত দে সিনেমার জন্য একজন শিশুশিল্পীর দরকার ছিল, যেটি শাবানার ছোটবেলার। মনমতো কাউকে পাচ্ছিলাম না। আলমগীরের বাসায় আঁখিকে দেখলাম। কেন যেন মনে হলো, সে এই চরিত্রে কাজ করতে পারবে। আলমগীরকে বললে রাজি হয় না। তারপর আমি একরকম জোর করেই আলমগীরের সঙ্গে আঁখিকে শুটিং স্পটে নিয়ে যাই। পরিচালক তাঁকে দিয়ে মনের মতো করে কাজটি করে নিলেন। সেই ছবিতে আঁখির দারুণ অভিনয় তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয়।’
শাবানার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুমী ইকবাল বিয়ে করে এখন পুরোদস্তুর সংসারী। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছোট মেয়ে ঊর্মি সাদিক ও একমাত্র ছেলে নাহিন সাদিক এখনো বিয়ে করেননি।
এদিকে কথায় কথায় রাতের খাবারের সময় হয়ে গেল। শাবানার ডাকে আড্ডার বিরতি টেনে খাবার টেবিলে বসতে হলো। বলেছিলেন ডাল-ভাত খাওয়াবেন। কিন্তু খাবারের টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন কয়েক পদের মাছ, মুরগির রোস্ট, খাসির রেজালা, চিংড়ি, সবজিসহ আরও অনেক কিছু। সবই নিজ হাতে রান্না করেছেন শাবানা।
শাবানা বলেন, ‘দেশের বাইরে হয়তো অনেক চাকচিক্যের মধ্য দিয়ে জীবন পার করা যাবে, কিন্তু শান্তি পাওয়া যাবে না। তাই তো সুযোগ পেলেই চলে আসি।’ রাস্তাঘাটের নিরাপত্তাসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে উন্নতি করতে পারলে বাংলাদেশের চেয়ে শান্তি বিশ্বের আর কোথাও আছে কি না, তাঁর জানা নেই।
আড্ডা দিতে দিতে রাত বাড়ে। শাবানা ও ওয়াহিদ সাদিকের আন্তরিকতার মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে আসি।


No comments:
Post a Comment