সর্বশেষ সংবাদ

শিল্পপতি জহুরুল ইসলামঃ একজন কর্মবীর সফল উদ্যোক্তা



যার শ্রম, মেধায়, সততা, একনিষ্ঠতা, আÍবিশ্বাস, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে। দেশের সীমানা ডিঙিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে তার ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের দুয়ারও খোলে তার মাধ্যমে। শুধু বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানেই নয়, তার জনহিতের হাত প্রসারিত হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, ব্যাংক, কৃষিতে।
জহুরুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দালনের সময় পাকিস্তান সরকারের জেলে আটক নেতা-কর্মীদের মোকদ্দমাদির খরচ, আহতদের চিকিৎসার খরচ জোগাতেন। ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন তিনি। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে নীরবে-নিভৃতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুরুল ইসলাম।
ভাগ্যান্বেষণে সততা-পরিশ্রম-আÍবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ কত মহীয়ান-গরীয়ান হতে পারেন, তিনি সেই বিস্ময়কর উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন। দেশবরেণ্য এই কৃতী শিল্পপতি ১৯৯৫ সালের ১৮ অক্টোবর, ৬৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
জন্ম: শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম ১৯২৮ সালে ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জ জেলা বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ্ব আফতাব উদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন বাজিতপুর পৌরসভার (১৯৫৮-১৯৬১) সালের চেয়ারম্যান। তার দাদা হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন বাজিতপুরের সুপরিচিত মুখ। মা মোছা. রহিমা খাতুন ছিলেন মহিয়ষী দানবীর নারী।
বংশ: আলহাজ্ব জহুরুল ইসলামে পূর্ব পুরুষ ছিলেন ভাগল খাঁ। ভাগল খাঁ এই অঞ্চলে আগমনের দুটি জনশ্রুতি রয়েছে। অধিক সংখ্যক মানুষের মতে, মুঘল আমলে বায়েজিদ খাঁ নামক জনৈক রাজ কর্মচারী তার অপর তিন ভ্রাতা ভাগল খাঁ, পৈলান খাঁ, দেলোয়ার খাঁ দিল্লী থেকে এই অঞ্চলে আসেন। কিছু দিন পর তারা বাজিতপুরের আস পাশে বাসস্থান করে বসবাস করেন। এই সময় বায়েজিদ খাঁর বসবাসের এলাকাটাকে বায়েজিদপুর, পরে উচ্চারণ বিবর্তনে বাজিতপুর, ভাগল খাঁর নামে ভাগলপুর, পৈলান খাঁর নামে পৈলানপুর, দেলোয়ার খাঁর নামে দিলালপুর পরিচিতি লাভ করে।
দ্বিতীয় জনশ্রুতিতে বলা হয় বায়েজিদ খাঁ নামে মোগল সেনাপতিকে প্রেরণ করা হয়েছিল হাওড় অঞ্চলে ঈশা খাঁর অগ্রগতিকে রোধ করার জন্য। বায়েজিদ খাঁ তার সাথে তিন ভাইকে নিয়ে আসেন। ঈশা খাঁ তখন হাওড় অঞ্চলে ঘোড়াউত্রা নদীর পূর্ব পাশে ছিল। বায়েজিদ খাঁ অবস্থান নেন ঘোড়াউত্রা নদীর দুই মাইল পশ্চিমে বর্তমান বাজিতপুরে।তবে বায়েজিদ খাঁ সাথে ঈশা খাঁ কোন যুদ্ধ অথবা সন্ধি হয়েছিল কিনা তার ইতিহাস থেকে জানা যায়নি।
বায়েজিদ খাঁ ও তার তিন ভ্রাতা এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে শ্রীধরগঞ্জের আশে পাশে বর্তমান বাাজতপুর বাজার, ভাগলপুর, দিলালপুর ও পৈলানপুরে বসবাস শুধু করে। জহুরুল ইসলামে সন্তানগণ: ১। মঞ্জুরুল ইসলাম (বাবলু) ২। সাইদা ইসলাম (বেবী) ৩। মাফিদা ইসলাম (শিমি) ৪। নাইমা ইসলাম (ইমা) ৫। কানিতা ইসলাম (কানিতা)। মঞ্জুরুল ইসলাম বাবলুর সন্তান- ১। কাশফিয়া ইসলাম
শৈশব এবং শিক্ষা:- ছোট বেলা জহুরুল ইসলাম ছিলেন বিনয়ী মিশুক ও দুরন্ত প্রকৃতির। সমবয়সীদের সাথে ঘুরে বেড়ানো এবং খেলাধুলায় ছিল খুব আগ্রহ। গরীব দু:খীদের পাশে দাড়িয়ে সহযোগীতা করার সভাব ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্থানীয় স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে কিছু দিনের জন্য সরারচর শিবনাথ হাই স্কুলে পড়েন। সে খান থেকে স্কুল পরিবর্তন করে বাজিতপুর হাই স্কুলে ভর্তি হন। লেখা-পড়ার এক প্রর্যায়ে চাচার সাথে কলকাতায় চলে যান। সে খানে রিপন হাই স্কুল থেকে ইংরেজি মিডিয়ামে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করে বর্ধমান কলেজে ভর্তি হন। পরে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হয়ে মেধা থাকার সত্ত্বেও লেখা-পড়া চালিয়ে যাওয়া হলনা।
চাকরি এবং ব্যবসা:– আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা হলনা তার। ফলে ১৯৪৮ সালে ৮০ টাকা মাসিক বেতনে সি এন্ড বি এর ওয়ার্ক এ্যাসিসটেন্ট হিসাবে তিনটি বছর সুনামের সাথে চাকরি করে ১৯৫১ সালে পদত্যাগ করেন। অফিসার তার পদত্যাগের কথা শুনে উচ্চ পদে উন্নতি করন সহ লোভনীয় প্রস্তাব দেন। জহুরুল ইসলাম তা প্রত্যাখান করে বাবা ছোট-খাট ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। প্রথমদিকে পিতার সাহায়তাকারী হিসাবে বিভিন্ন স্থানে পরিচিত হন। পরবর্তিতে নিজেই ঠিকাদার হিসাবে তালিকাভূক্ত হন। ঠিকাদার হিসাবে প্রথম কাজ হল সরকারি অফিসে বার শত টাকার স্টেশনারী দ্রব্য সরবরাহ করা। দ্বিতীয় কাজ কিশোরগঞ্জ পোষ্ট অফিস ঘর নির্মাণ। এই ভাবে একের পর এক কাজ আসে ব্যস্ত হয়ে পরেন তিনি। এরই মধ্যে জহুরুল ইসলাম প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসাবে স্বীকৃতি পান। কঠিন শ্রম, মেধা আর ধৈর্য সাহস নিয়ে সৃষ্টি করতে থাকেন দেশের সরকারি এবং বেসরকারি বড় বড় ভবন, রাস্তা, ঘাট। এইগুলো মাঝে উল্লেখযোগ্য-
১। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান
২। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ৩। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন
৪। হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর টার্মিনাল।
৫। জীবন বীমা ভবন।
৬। সাধারণ বীমা ভবন।
৭। টোয়েটা ভবন।
জহুরুল ইসলাম শুধু বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেনা। পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসাবে সুনামের সহিত আমৃত্যু কাজ করেছেন। তিনি ঠিকাদারির পাশা পাশি বিভিন্ন ব্যবসার মাঝে মনযোগ দেন। তার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো হলো:
১। ইষ্টার্ণ হাউজিং লিমিটেড।
২। নাভানা গ্রুপ লিমিটেড।
৩। আফতাব অটোমোবাইলস।
৪। নাভানা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
৫। ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
৬। ঢাকা ফাইবার্স লিমিটেড।
৭। নাভানা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড।
৮। দি মিলনার্স ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
৯। ইষ্টার্ণ এষ্টেটস লিমিটেড।
১০। ভাগলপুর ফার্মস লিমিটেড।
১১। মিলনার্স টিউব ওয়েলস লিমিটেড।
১২। এসেনশিয়াল প্রডাক্টস লিমিটেড।
১৩। ইসলাম ব্রাদার্স প্রেপাটিজ লিমিটেড।
১৪। জহিরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
১৫। আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড।
১৬। আফতাব কারুপণ্য।
১৭। বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশ লিমিটেড।
১৮। দি রিভার ভিউ লিমিটেড।
১৯। ইষ্টার্ণ এষ্টেট লিমিটেড।
২০। আলস লিমিটেড।
২১। আল-হামরা গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
২২। আফতাব ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড।
২৩। আই এফ আই সি ব্যাংক লিমিটেড।
২৪। উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড।
বিবাহ ও পরিবার: জহুরুল ইসলাম ১৯৫৬ সালে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার অধ্যাপক আলহজ্বা মোশাহেদ আলী চেীধরীর কন্যা সুরাইয়া বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জীবন সঙ্গিনী সুরাইয়া ইসলাম ছিলেন তার জীবনের অনূপ্রেরণা প্রধান উৎস। বিবাহের ৫ বছর পর তাদের প্রথম সন্তান মঞ্জুরুল ইসলাম (বাবলু) জন্ম গ্রহণ করেন। তার পর একে একে আর ৪ মেয়ে সন্তানের পিতা হন জনাব জহুরুল ইসলাম। তারা কন্যাদ্বয় হলেন ১। সাঈদা ইসলাম (বেবী) ২। মাফিদা ইসলাম (শিমি) ৩। নাইমা ইসলাম (ইমা) ৪। কানিজা ইসলাম(কানিতা)।
আত্মীয়পড়ায়ন:- আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম ছোট বেলা থেকেই ছিল মুক্ত মনের মানুষ। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজন এলাকার মানুষদেরকে সাহায্য সহযোগীতা কারার প্রতি ছিল প্রচন্ড আগ্রহ। লেখা পড়া শেষে যখন চাকরি পরবর্তী ব্যবসা শুরু করেন তখনি ১৩ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের সকলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ভাই বোন সকল কে স্কুল/কলেজে ভর্তি করে দিয়ে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। কাছের কিংবা দূরের আত্মীয় স্বজনদেও কে অর্থনৈতিক ভাবে সাবলম্বি করতে তিনি বিভিন্ন প্রদক্ষেপ নেন। বাজিতপুরের মানুষদের কর্মস্থানের জন্য বাজিতপুরে গড়ে তোলেন অধশতাদিক ফার্ম। আত্মীয় স্বজন এলাকাবাসীর উত্তম স্বাস্থ্য সেবার জন্য বাজিতপুরে গড়ে তোলা হয় জহরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নার্সেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ভাগলপুরে গড়ে তোলা হয় উন্নত মানের শিক্ষা নগরী। তিনি কখনও একা খেতে বসতেন না আত্মীয় স্বজন এলাকবাসীদেরকে সঙ্গে নিয়ে খেয়ে তৃপ্তি পেতেন। আত্মীয়র সমস্য সমাধানে তিনি কখন বিরুক্ত হতেন না। সকল কে উপরে তোলার চেষ্টা ছিল তার মাঝে। ছোট ভাই শফিউল ইসলাম (কামাল), জহুরুল ইসলাম সর্ম্পকে বলতে গিয়ে আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। তিনি বলে জহুরুল ইসলাম শুধু আমার ভাই না আমার বাবা, আমার জীবন, আমার সব। তার মত চরিত্রবান লোক আমার চোখে পড়েনা।
ধর্ম পরায়ন:- উন্নত চরিত্রের অধিকারী শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম ছিলেন একজন ধর্মভীরু মুমিন মুসলামান। এক আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস, নবী মোহাম্মদের আদেশ উপদেশ পালনে তিনি ছিল খুবই আন্তরিক। প্রচুর ধন সম্পদের মধ্যেও তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের মাঝে সামঞ্জস্য রেখে পথ চলেছেন সবসময়। প্রচারবিমূখ জহুরুল ইসলাম প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ডান হাতে দান করতেন বাম হাতকে না জানিয়ে। তার কাছে সাহায়্যে চেয়ে শূন্য হাতে ফিরেছেন এমন ইতিহাস নেই।
নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতে ব্যপারে তিনি ছিল খুবই সচেতন। পুত্র মঞ্জুরুল ইসলাম পিতার সর্ম্পকে বলেন। আমি বাবার মাঝে বদ অভ্যাস, বদ স্বভাব কোন দিন লক্ষ করিনি। তিনি নেশা জাতীয় দ্রব্য এমনকি পান, সিগারেট খেতেন না। তিনি অসম্ভব রকমের ধার্মিক ছিলেন। কোন রকমের মিতব্যয়ী পছন্দ করতে না। বার বছর বয়স থেকে নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন। জীবনে কোন দিন নামাজ ছেড়ে দিতে দেখিনি। যতদিন শক্তি ছিল, সমর্থন ছিল ততদিন হজ্ব পালন করেছেন। মাঝে মাঝে দুর্বল শরীর নিয়েও বছরে ২/৩ বার ওমরাহ করেছেন। হজ্বে বেশি ভীড় হতো বলে তিনি ওমরাহ করতেন। বাবা বলতো তাঁর জন্য ওমরাহ হচ্ছে বাস্তবের ছুটির সময়। কারণ ঐ একটি জায়গায় যে খানে ব্যবসা বাণিজ্য পরিবারকে ভুলে আল্লাহর ইবাদাত করা যায়।
জহুরুল ইসলাম জামাতে নামাজ পড়তে খুব প্ছন্দ করতেন। সে কারণে তার প্রতষ্ঠিত প্রত্যেকটি স্থাপনা প্রকল্প মসজিদ ও ইমামের ব্যবস্থা করতেন। রোজার ব্যপারে তিনি ছিলেন আর বেশি সিরিয়াস। একবার ভুল করে একটি রোজা ভেঙ্গে গেলে ইমাম সাহেবের শরনাপন্ন হন। ইমাম একটি রোজার বিপরীতে ৬০ জন মিসকিনকে খাইয়ে দিতে বলেন। জহুরুল ইসলাম ইমাম সাহেব কে বলেন এতেতো আমার কোন কষ্ট হবেনা। বরং আমি ৬০টি রোজা রেখে ফেলি। এই বলে একাধারে ৬০টি রোজা রাখলেন। ইসলাম সাহেবে জীবনে কত বার হজ্ব করেছেন তা তার জানা নাই। তিনি হজ্বকে পুণজন্মে মত করে দেখতেন। যাকাতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সব সময় অগ্রগামী। হিসাবে অতিরিক্ত যাকাত প্রধান করে তিনি আল্লাহ কাছে শোকর আদায় করিতেন।
আর্ন্তজাতিক: অধ্যবসায়, পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা, কর্মক্ষমতার মাধমে শিল্পপতি জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে পেয়ে ছিলেন ব্যবসায়িক স্বীকৃতি। কাজের সুবিধার্তে ১৯৭১ সালে লন্ডনে একটি অফিস খোলেন। বলা য়েতে পারে সে অফিসের মধ্যদিয়ে বিশ্বের দ্বার উন্মচিত হয়। একে একে নির্মাণ করিতে থাকেন মধ্যপ্রচ্যে ৯০ কিলোমিটার লম্বা রাস্তা।
আবুধাবীতে ৫ হাজার বাড়ি। ইরাকে বৈজ্ঞানিক প্রদ্ধতিতে অত্যাধুনিক ইট তৈরির কারখানা। ইয়েমেনে রাজধানীর পাশে একটি উপ শহর। ইরাকে বিখ্যাত সিটি সেন্টার ও আবদুর কাদির জিলানী (র:) মাজার শরীফ কমপ্লেক্স এর পাশে বিনা লাভে একটি আধুনিক মানের গেষ্ট হাউস সহ অসংখ্য স্থাপনা। এই সময় তিনি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের শ্রমীক নেয়ার পথ উন্মক্ত করে। মধ্যপ্রচ্যে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। লন্ডনে বসেই নামে বেনামে কোটি কোটি টাকা সাহায্য করেন বাংলাদেশকে।
নগরায়ন: আগামী দিনের চিন্তা চেতনায় বলিয়ান জনাব জহুরুল ইসলাম বাংলাদেশের মানুষদের শিখিয়েছেন কি ভাবে ডোবা, নালা, খাল-বিল, ময়লা-আবর্জনাকে মাটির নীচে চাপা দিয়ে গড়ে তোলতে হয় মানুষের উপযুগি সকল সুযোগ সুবিধা সাম্বলিত আধুনিকমানের শহর।
অপরিকল্পত, দূষণযুক্ত, রাস্তাবিহীন শহরের বিপরীতে তিনি প্রথম গড়ে তুলেছেন অশংখ আবাসিক প্রকল্প, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। তার প্রতিষ্ঠত ইষ্টার্ণ হাউজিং লি:, ইষ্টাণ টাওয়ার , ইষ্টাণ ভিউ, ইষ্টার্ণ পয়েন্ট, ইষ্টার্ণ ভেলী, ইষ্টার্ণ নিকুঞ্জের মাধ্যমে ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ পরিবারকে। শহরে আশে পাশে গড়ে তোলেছেন পল্লবী, আফতাবনগর, রূপনগর, গোড়ান, বণশ্রী, নিকেতন, মহানগর, গাড়াডোগা, মাদারটেক, মায়াকুঞ্জ নামে আবাসিক প্রকল্প। এই সব প্রকল্পে ৫শত থেকে কয়েক হাজার ছোট, বড়, মাঝারি আকারে প্লট রয়েছে। সে সব প্রকল্পে একাদিক মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, শিশু পার্ক, সুপার মার্কেট সহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা রয়েছে। ঢাকার নগরায়নে ৪০% ইসলাম সাহেবের অবদান। তিনি প্লট, ফ্ল্যাটের পাশা পাশি ঢাকা শহরে প্রাণকেন্দ্র গড়ে তোলে ইষ্টার্ণ প্লাজা, ইষ্টার্ণ মল্লিকা, ইষ্টাণ প্লাসের মত অত্যাধনিক এসি র্মাকেট।
তিনি ঢাকার শহরে উপর চাপ কমাতে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা হাতে নেন। তার দূরদর্শী চিন্তা আলোকেই ঢাকার পাশে সাভারে ১২০০ একর, অন্য অন্যস্থানে আর ১৫০০ একর জমি খরিদ করেন।
জনকল্যাণ: সকল গুনে গুনান্বিত জনাব জহুরুল ইসলাম মানুষকে দান ও সহযোগীতা করে আনন্দ পেতেন। মানুষের উপকারে কথা চিন্তা করে তার জীবনে বেশিটা সময় কাটিয়ে ছেন। একে একে সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। দেশে এবং বিদেশে কুড়িয়েছেন সুনাম। নিচে তার জনকল্যাণমূলক কাজের অংশবিশেষ।
* জহুরুল ইসলাম এডুকেশন কমপ্লেক্স। যার অধীনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে অর্ধশত স্কুল, কলেজ, মাদ্রসা রয়েছে।
* জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নার্সেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। যেখানে প্রতিবছর হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা করা হয়। সৃষ্টি করা হয় শত শত ডাক্তার, নার্স।
* মাজেদুল ইসলাম শিক্ষা কল্যাণ ট্রাষ্ট। এর মাধ্যমে দেশের গরীব দু:খী, বৃত্তি প্রাপ্ত ছাত্রদের সাহায়্য করা হয়।
* ঢাকাস্থ বাজিতপুর সমিতি, কিশোরগঞ্জ সমিতি, বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতি, মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব সহ অসংখ প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের ডোনার।
* স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময় নামে বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা সাহায্য করেন বাংলাদেশের
* ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের সময় বছর ব্যাপি কিশোরগঞ্জে ২০০টি লঙ্গর খানা ব্যবস্থা করেন।
* বাংলাদেশের বেকার যুবকদের জন্য বিদেশে কর্মস্থানের সৃষ্টি করেন।
* আফতার গ্রুপের অধিনস্থ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকায় ৪০% মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করেন।
বাজিতপুরে জহুরুল ইসলাম:- ঐতিহ্যবাহী বাজিতপুরে যুগে যুগে অনেক আলোকিত মানুষের জন্ম হয়েছে। তাদের কর্মদক্ষতা এই জনপদকে করেছে আলোকিত। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ৪০ দশকে খান বাহাদুর আবদুল করিম।
৫০ দশকে হামিদউদ্দিন খান। ৬০ দশকে আবদুল মোনেম খান। সর্বশেষ শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম এই জনপদের অহংকার গৌরব। তার অসাধারণ অধ্যবসায়, পরিশ্রম, সততা, নিষ্টা ও কর্মক্ষমতার সারা দেশের মত বাজিতপুরের প্রজলিত হয়েছে। সুদূর প্রসারি চিন্তার আলোকে বাজিতপুর হয়ে উঠেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাঝারি শিল্পের নগরী, কৃষি খাতে এনেছে আমুল পরিবর্তন।
শিক্ষা:- শিক্ষা আধুনীকায়নে জহুরুল ইসলাম এডুকেশন কমপ্লেক্স এই জনপদকে করেছে আলোময়। তিনি জানতেন এবং মানতেন শিক্ষাই জাতীর মেরুদন্ড। আর সে কারনে প্রত্যক ও পরোক্ষ ভাবে বাজিতপুর, তার আসে পাশের স্কুল কলেজ গুলোতে মান উন্নয়নে গুরত্ব পূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি বাজিতপুরের পশ্চিম অঞ্চলে গড়ে তোলেন আধুনিক উন্নতমানের শিক্ষালয়। সেগুলো হলো- জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, নার্সেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, আফতাব উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ, বেগম রহিমা খাতুন গালর্স হাই স্কুল।
স্বাস্থ্য: স্বাস্থ্যখেতে তার অবদান অনস্বীকার্য। গরীব দু:খি মানুষের কথা চিন্তা করে ভাটি জনপদের প্রবেশ মূখে গড়ে তুলেছেন বিশাল জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল ও নাসিং হোম। ফলে কিশোরগঞ্জ তার আশ পাশের জেলা গুলো মানুষ জন উত্তম সেবা পেতে ছুটে আসেন জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হসপিটালে। সর্ব শ্রেণীর মানুষের সেবা উপযোগী এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে হাজার হাজার মানুষকে সেবা দিয়ে থাকে। পাশাপাশি প্রতি বছর শতশত ডাক্তার নার্স পাশ করে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তরে মানুষের সেবাই।
খাদ্যশস্য: জহুরুল ইসলাম মানুষের মূলিক চাহিদা পূরনে সূযোগ সৃষ্টি করে দেয়ার ব্যপারে ছিল আন্তরিক। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্যের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাদ্য ডিম, মুরগী, মাছ, দুধ, শাক সবজি উত্তম ফলনে দেশী বিদেশী বিশেষজ্ঞ দ্বারা গবেষণা করে উন্নত মানের বেশি খাদ্যশস্য বাজার জাত করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার প্রতিষ্ঠিত শতশত খামার হতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ডিম, মাছ, মুরগী, দুধ সারা দেশে পুষ্টিকর খাদ্য পূরণে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
রাস্তা: জহুরুল ইসলাম জানতেন কোন অঞ্চলের উন্নয়নের পূব শর্ত হল সে এলাকার রাস্তা ঘাটে উন্নয়ন। আর তাই বাজিতপুরে দুটি রেল স্টেশন থাকার পড়ও ভালগপুরে নতুন একটি রেল ষ্টেশন স্থাপণের প্রয়োজনীয় উপলদ্দি করে সে খানে রেল ষ্টেশন স্তাপন করেন। পাশা পাশি বাজিতপুরের রাস্তা গুলোকে ব্যাপক উন্নয়ন করেন। ভাগলপুরে বাস ষ্টেশন তৈরি করে ঢাকা টু ভাগলপুর, ভাগলপুর টু কিশোরগঞ্জের উন্নত বাস সার্ভিস চালো করেন। ফলে বাজিতপুর হতে দূত সময়ে বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলে যাওয়ার সুব্যবস্ত হয়। তিনি রাস্তা তৈরির সঙ্গে সঙ্গে বাজিতপুরে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানে জন্য মুরগীর র্ফাম সহ মাঝারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
মৃত্যু: এক বিশাল কর্মসম্রাজ্যের নীরব অধিপতি শিল্পপতি আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম ১৯৯৫ সালে ১৯ শে অক্টোবর রাত ২.৩০ মিনিটে দুনিয়ার সকল ভালবাসা ত্যাগ করে যাত্রা করেন অন্তিম পরলৌকিক গন্তব্যে। মৃত্যু কালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭টি বছর। দেশবরেণ্য শিল্পপতির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন ত্যকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিরোধী দলিয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশে বিদেশের অসংখ্য গুণীজন।
জন্ম ভূমি বাজিতপুরে তার লাশ: জহুরুল ইসলামের লাশ বহন কারি বিমান জিয়া আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দেরে পৌঁছালে সরকারি বেসরকারি শতশত মানুষ তাকে দেখতে ভিড় জমায়। বিমান বন্দর থেকে লাশ গুলশানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সে খানে হাজার হাজর গন্যমান্য বক্তিবর্গ শোক শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পর বাংলাদেশ জাতীয় মসজিদে জোহর বাদ জানাযা নামজ শেষে ভাগলপুর নিয়ে আসে। রেডিওতে এই খবর শুনে দ্রুত ভাগলপুর চলে যাই। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মাঝে হাজার মানুষের ভীড়ে আমি যেন এক অসহায় কিশোর। বিকাল ৪টা দিকে মরহুমের লাশ কফিনে করে ভগলপুর এসে পৌছানে যেন এক জন সমদ্র সৃষ্টি হয়। শত চেষ্টায় কালো গোল্ডেন রঙ্গের কফিন টিকে না ছুয়েই সন্ধ্যা লগনে বাড়ি ফিরতে হল। সে যে কত বড় পরশ পাথর ছিল। ইতিহাস আজ নয় কাল, শত বছর পরে বলবে তুমি আমাদের এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। তোমাকে নিয়ে গৌরব করি । তুমি বেঁচে থাকবে যুগ যুগ ধরে বাংলায়।

No comments:

Post a Comment

Designed by Copyright © 2014
Powered by Blogger.