বছরের শেষে এসে নেটফ্লিক্সের ব্যানারে মুক্তি পেলো মারভেল কমিক সুপার হিরো / এন্টি হিরো টিভি সিরিজ Punisher । মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে দেওয়া সিরিজটি সবার মন জয় করে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। Punisher একজন নিঃস্ব ব্যাক্তির বেপরোয়া হয়ে ওঠার গল্প।
সমাজের নিয়ম শৃংখলা,নীতির বিপরীত স্রোতের শিকার হওয়া একজন বাবা এবং স্বামীর একাকিত্তে ভরা জীবনের শেষ ইচ্ছার গল্প। মিলিটারি জগতের অন্ধকার অধ্যায় যে কতটা ভয়াভহ এবং করুন হতে পারে তা এক্স মেরিন ফ্রাংক ক্যাসেলের জীবনীর মাধ্যমে কিছুটা ধারনা পাওয়া যায়। অনেকেই চরত্রটিকে ডিসি কমিকের ব্যাটম্যান আর হালের হিট্ম্যান জন উইক ভার্শন বলতে পারেন তবে Punisher-র অরজিন অনেক পূরানো।
মার্ভেলের আরেক হিরো ডেয়ারডেভিলের সিজন ২ এ প্রথম Punisherকে দেখা যায় লাইভ একশনে। তখন ব্যাপক জনপ্রিয় চরিত্র ডেয়ারডেভিলকে হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাটে রীতিমত তুলোধুনো করে বিষ্ময়ের জন্ম দেয় চরিত্রটি। নেটে এবং ব্লগ গুলোয় সমানতালে রিভিউ চলে হ্যূ ইজ দিস গাই। তবে যারা Punisher কমিক পড়েছেন অথবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে Punisher সম্পর্কে অবগত ছিলেন তারা জানতো দিস ইজ মাইটি Punisher।
ডেয়ারডেভিলের ঐ সিজনে Punisher চরিত্রটি সবার মনে দাগ কেটে যায়। আর সবকিছু ছাড়িয়ে Punisher হয়ে ওঠে আলোচনার মূল বিষয়। চরিত্রটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে নেটফ্লিক্স একই অভিনেতাকে নিয়ে কয়েক মাসের মধ্যে Punisher সলো সিরিজ আনার ঘোষনা দেয়। ফ্র্যাংক ক্যাসেলে দি Punisher মানেই ধ্বংস। নিজের গড়া আদালতে দোষীদের নিজে হাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাই ফ্র্যাংক ক্যাসেলের একমাত্র রায়।
যেখানে একটাই রুল ” নো মার্সি”।
আফগানিস্থান যুদ্ধে একজন সি.আই.এ এজেন্ট বেআইনীভাবে ফিল্ড সোলজারদের একটি বিশেষ ইউনিট দিয়ে ড্রাগ ট্যারিফ নিয়ন্ত্রনে বাধ্য করে। একজন আফগান লোকাল পুলিস এজেন্টের কাছ থেকে সেই হিরোইন পাচারের ইনফরমেশন ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাকে নির্মমভাবে টর্চার এবং পরে মেরে ফেলা হয়। সেই বিশেষ ইউনিটের একজন সদস্য ছিলেন ফ্রাংক ক্যাসেল। ঘটনার ভয়ভহতা এবং বিবেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ্য ফ্রাংক ইউনিট ছেড়ে পলায়ন করে । এদিকে উধাও হয়ে যাওয়া ফ্র্যাংককে খুজে না পেয়ে সেই সি.আই.এ এজেন্টের নির্দেশে ফ্র্যাংক ক্যাসেলের পুরো পরিবারকে মেরে ফেলা হয়, আশা করা হয় এবার ফ্র্যাংক ক্যাসেল গা ঢাকা থেকে বেরিয়ে আসবে। আর তারপরই ফ্র্যাংক ক্যাসেলের আবির্ভাব ঘটে। স্ত্রী সন্তান হারিয়ে প্রতিশোধের নেশায় পাগলপ্রায় ফ্র্যাংক ক্যাসেলের সামনে একের পর এক পতন ঘটে আইনশৃংখলা বাহীনির উচ্চপদস্থ দুর্নীতিগ্রস্থ অফিসারদের। ফ্র্যাংক হয় মোষ্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল। আর সব সুপারহিরোদের সাথে এখানেই Punisherের রাস্তা একেবারে ভিন্ন। অন্য সুপারহিরোরা যেখানে মানুষ খুন করেনা সেখানে Punisherের হাতে পড়লে নিশ্চিত মৃত্যূ। একের পর এক বাধা টপকে সামনে এগোতে থাকে বেপরোয়া ফ্র্যাংক তার শেষ লক্ষের উদ্দেশ্যে। এভাবেই গল্প এগিয়ে যায় চরম পরিনতির দিকে।
সহকারী চরিত্র বিশ্লেষনে সবার আগে আসবে লুইস ওয়াল্কট চরিত্রে রূপদানকারী ড্যানিয়েল ওয়েবারের কথা। একজন যুদ্ধফেরত মানষিক বিকারগ্রস্থ তরুনের চরিত্রে দারুন অভিনয় করেছেন ড্যানিয়েল ওয়েবার। ওয়ার ক্রাইমের সাইড ইফেক্ট এবং যুদ্ধের নোংরা পরিস্থিতির শিকার হওয়া লুইস পোষ্ট ওয়ার ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার অবসাদে ভোগে। সে যেন ফ্র্যাংক ক্যাসেলের আরেক সত্তা হিসেবে হাজির হয় নিউ ইয়র্ক সিটিতে। নিজের মনে তৈরি হওয়া মতাদর্শ গ্রাস করে লুইসের ন্যায়বিচারের চেতনাকে।
একজন মৌলবাদী হিসেবে রুপান্তরিত লুইস বোমা হামলা শুরু করে নিরীহ জনগনের ওপর। লুইসের গল্পটি ফ্র্যাংক ক্যাসেলের তথা সমাজের নীতি নির্ধারকদের জন্য সতর্কবানী। ভিলেন আর এন্টি-ভিলেইনের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়া এই চরিত্রটির পরিনতি সম্পর্কে ড্যানিয়েল ওয়েবার বলেছেন “ছয় মাস ধরে ট্রেনিং করেছি চরিত্রটির জন্য। একটি সুন্দর সমাপ্তি হয়েছে চরিত্রটির, লুইস ওয়ালকট ফ্র্যাংকের জন্য একটি সতর্কবানী। আমি চেয়েছি ফ্রাংক ক্যাসেল লুইসের পরিনতি দেখে শিখুক আর নিজেকে গড়ে তুলুক”।
মূল ভিলেইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন পল শোলজ। একজন মাষ্টারমাইন্ড আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া চরিত্রটির যথাযথ ব্যাবহার করেছেন ভদ্রলোক। গম্ভীর চেহারা আর চোখের কোনে ভয়ংকর দাগ নিয়ে হাজির হওয়া সি.আই.এ সহকারী এজেন্ট রোলিন্সই সেই ব্যাক্তি যাকে মারার জন্য যুদ্ধ ঘোষনা করে ফ্র্যাংক ক্যাসেল।
মূল ভিলেইন রোলিন্সের ডান হাত বিলি রূশো চরিত্রটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শয়তানের একনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বিলি রুশো চরিত্রে নিজের অভিনয় কারিশ্মা দেখিয়েছেন বেন বার্নস। যেকোন পরিস্থিতিতেই পরিকল্পনা মাফিক কাজ করেন বিলি রুশো,তবে চরিত্রটির আবেদন আরো শক্তিশালী করা যেত। আশাকরি সিজন ২ এ দেখানোর জন্য জমিয়ে রেখেছেন পরিচালক। ক্যাসেল ফ্র্যাংকের বন্ধু মাইক্রো এবং কার্টিস পুরা সময় জুড়ে ফ্র্যাংককে সহায়তা করতে দেখা যায়। বিশেষ করে মাইক্রো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ফ্রাংকের পাশে ছিলেন। একেই না বলে বন্ধুর মত বন্ধু । মাইক্রো চরিত্রটি সবার কাছেই প্রিয় হবে তার বন্ধুবৎসল মনোভাবের জন্য। এছাড়া ডেয়ারডেভিলের কেরেন পেইজের দেখা মিলবে সিরিজটির আকর্ষন বাড়িয়ে দিতে।
Punisher চরিত্রে জন বার্নথল ছিলেন একেবারে সেরা। তার গমগমে ভোকাল, রাগী এটিচূট, আর নন স্টপ একশন রিদম সত্যিই ভয়াভহ। বডি ল্যাংগুয়েজে সবসময় একটা মার-মার কাট ভাব ছিলো। প্রচুর রক্তপাতের দৃশ্য থাকায় স্ক্রিনে জন বার্নথালকে দেখলেই বলতে বাধ্য হবেন “মাইর শুরু হবে কখন”।
ফ্র্যাংক ক্যাসেলের কোমল এবং কঠিন আবেগপূর্ণ স্মৃতিগুলো চেহারা আর অভিনয়ে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বার্নথল। এখানেই সিরিজটির সার্থকতা। Punisher-র মূল চরিত্রে একদম মনের মত অভিনেতা পাওয়া গেছে। আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এককথায় অসাধারন। একশন দৃশ্যে একুইস্টিক গিটার সাথে পিয়ানো কম্পোজিশন ইমোশোনাল করে দিবে কিছু কিছু যায়গায়।
সিজন ২ এর জন্য অলরেডি কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আশা করি আরো ভালোকিছু নিয়ে হাজির হবেন ফ্র্যাংক ক্যাসেল aka দি Punisher।
ততদিন পর্যন্ত চলুক “One batch, two batch. Penny and dime”।


No comments:
Post a Comment