কলকাতা আমার কাছে ভীষণ রকম গতানুগতিক। নিস্তরঙ্গ। বৈচিত্রহীন একঘেয়ে। ছোট থেকেই এই শহরে মানুষ হয়েছি। জন্ম থেকে এই শহরটা ছাড়া আর কোনও শহর দেখিনি। নাটক করে দিন গুজরান করি। সেটাই আমার পেশা। তাই পেশা সূত্রে কখনও- সখনও দেশের অন্য শহর দেখেছি। খানিক ঘুরেছি।
দেশের বড় শহরগুলোকে দেখলে তাক লেগে যায়। সেখানকার মানুষেরা দেখতে কত
সুন্দর, সেখানকার রাস্তাঘাট কত গোছানো, সেখানকার দোকান-বাজার, বড় বড়
বাড়ি, এমনকী এয়ারপোর্টটাও কত কত বেশি সাজানো। লজ্জা হয়। আমি কলকাতার মেয়ে।
আমার চারপাশের লোকগুলো দেখতেও ভাল না, কোনও কাজেরও না। আমাদের একটাও তেমন
সুন্দর মেট্রো রেল নেই। লোকাল ট্রেনগুলো দেখলে গা শিউরে ওঠে। আমার শহরের
রাস্তায় বৃষ্টিতে জল জমে। ভিখিরিগুলো পায়ে সুড়সুড়ি দেয়। লোকাল বাসে
ঘামের গন্ধে টেকা দায়। ট্রাফিক জ্যাম আর প্রস্রাবের গন্ধ এই শহরের সমস্ত
গ্রগতি স্তব্ধ করে দিয়েছে। এক মুহূর্তের নৈঃশব্দ্য নেই। শান্তি নেই।
পরিচ্ছন্নতা নেই। শৃঙ্খলা নেই। ছোটবেলায় তবু মাঝেসাঝে ইডেনে ম্যাচ দেখতে
যাওয়ার সুযোগ ছিল। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় টিম থেকে বাদ পড়ার শোক যে নিতে পারল
না বঙ্গবাসী। তার পর থেকে ইডেনে খেলা হলেও ম্যাচ দেখতে যাওয়ার সঙ্গী জুটত
না। ফলে শহরের একমাত্র উত্তেজনাটিতেও আমার ভাঁটা দেখা দিল। একা একা কি
ক্রিকেট দেখা হয়! ধুর।
ঘোরার মতো কী আছে? সেই এক ভিক্টোরিয়া। তাও সেটা ‘ওদের’ তৈরি। পাশে
মোহরকুঞ্জ। প্রেমিকদের ভিড় দেখে আমার মতো ‘রুচিশীল’ মানুষের বড্ড অস্বস্তি
হয়। উল্টো দিকে নন্দন চত্বর। অকারণ ভিড় থাকে সেখানে। সেখানে আবার
প্রেমিক-প্রেমিকারা ছাড়াও কিছু ‘নাট্যমোদী’ ও ‘সংস্কৃতিমোদী’ রোজ ভিড় করে
দেখি। কী যে করে তারা। হলের বাইরে অত ভিড় কীসের! একাডেমি, নন্দন,
রবীন্দ্রসদন, শিশিরমঞ্চ, জীবনানন্দ সভাগৃহ, বাংলা আকাদেমি—এতগুলো
প্রেক্ষাগৃহ সেই চত্বরে। প্রেক্ষাগৃহের ভেতরে ভিড় না করে সব অকর্মণ্য
লোকগুলো বাইরে ভিড় করে। কী কাজ তাদের? পরনিন্দা, ‘ফেলিনি’-চর্চা ও হরিদার
দোকানের চার টাকার চা—এই হল তাদের ‘সংস্কৃতি’ চর্চা।
মঞ্চে শিল্পী।
কলকাতা আমায় কিচ্ছু দেয়নি। না ক্ষমতা, না সম্মান, না খ্যাতি, না বিলাস,
না রোজগার, না চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। সারা ভারতের নামকরা শহরগুলোর তুলনায়
আমরা কতটা পিছিয়ে। মুম্বই, হায়দরাবাদ, দিল্লি, আমদাবাদ, বেঙ্গালুরু,
চেন্নাই, চণ্ডীগড়—কা’কে ছেড়ে কা’কে দেখব। সেই তুলনায় আমরা তো আলোচনাতেই
আসি না। ঘেন্না ধরিয়ে দিল শহরটা।
কী পেয়েছি এখানে? শুধু মন কেমন করা। শহরটা ছেড়ে ক’দিনের জন্য দূরে
গেলেই খালি পিছুটান হয়। দুশ্চিন্তা হয়, আমার পাড়াটা ভাল আছে তো? রাতবিরেতে
মেয়েরা এখনও যাতায়াত করতে পারছে তো? পাশের বাড়ির বৃদ্ধের অসুস্থতায়
এলাকার ছেলেরা আজও হাসপাতালে রাত জাগছে তো? কী লাভ এ সব পাওয়ায়?
কী পেয়েছি এখানে? ভিনদেশি অতিথি পথ হারিয়ে ফেললে আমরা তাকে সাহায্য করতে
প্রাণ দিয়ে দিই। অন্ধ মানুষ দেখে এত মায়া হয়, অফিস কামাই করে হলেও তাকে
ঠিক বাসে তুলে দিই। পাড়ার মোড়ে মদের আড্ডা আটকাতে আমরা মার খাই। অসহায়
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবিতে মিছিলে পা মেলাই। স্কুল কলেজে গুন্ডামি হলে
গর্জে উঠি। সময়ে-অসময়ে পকেটের পয়সা খরচ করে লিটল ম্যাগাজিন বের করি। কী
লাভ এ সব করে?
কী পেয়েছি এখানে? গরিব ছেলেমেয়েগুলোকে পড়াতে ফ্রি কোচিং ক্লাস খুলি। আই
টি সেক্টরে চাকরি করলেও নতুন কবির কবিতা আমাদের চোখ এড়ায় না। অফিসের
ফাঁকে সুযোগ বানিয়ে নাটকের দলে ছুটে আসি। গান লিখি, মনের আনন্দে গাই। ‘নিজে
এক সময়ে এ সব সংস্কৃতি চর্চা-টর্চা করতাম। এখন পেট চালাতে নানা দিকে
দৌড়তে হয়। তাই নিজে নাটক করার সুযোগ হয় না।’ কিন্তু পাড়ার উঠতি ব্যান্ড
বা ছোট নাট্যদলগুলির জন্য আমাদের নিজের রোজগারের একটা অংশ বরাদ্দ রাখি।
ভাবটা এই—‘আমরা তো পারিনি, ওরা করুক’। কী লাভ এ সব সমাজসেবায়?
নাটকের মতো।
কী পেয়েছি এখানে? ‘নতুন’ রকম ভাবনা থেকে ‘নতুন’ কিছু করে দেখাব বলে
বাপের সব টাকা ঢেলে দিলাম নাটকের দলে। হলভাড়া দিতে নাভিশ্বাস উঠলেও নাটকের
ভূতটা মাথা থেকে নামে না। সকাল আটটা থেকে রিহার্সাল করি। দুপুরে মাঝে মাঝে
খাওয়ার সময় পাই। রিহার্সাল চলে রাত দশটা পর্যন্ত। তার পর দলের বাকি কাজ
সেরে আমরা বাড়ি ফিরে রান্না বসাই। ঘুমোতে ঘুমোতে আরও কত রাত। পরের দিন
আবার রিহার্সাল। মনে মনে ভাবি, ‘আমরা তো নিজের মধ্যে বয়ে নিয়ে চলেছি গিরিশ,
শিশির, বিজন, শম্ভু, উৎপল, বাদল, অজিতেশের ঐতিহ্যকে। এই মহৎ কাজে টাকার
মোহ করার পাপ আমাদের মানায় না। আমাদের লক্ষ্য অনেক বড়, অনেক বড় যুদ্ধে
আমরা ব্রতী’। না, এর বিনিময়ে আমরা কোনও পয়সা পাই না। কী আশ্চর্য, পয়সা চাইও
না! কার কাছে চাইব? আমাদের ঘরের টাকাতেই তো দলটা চলছে। কী লাভ নিজেদের এ
ভাবে ভাসিয়ে?
কী পেয়েছি এখানে? দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দাস ক্যাপিটাল আর রেড
বুক-এ মুখ গুঁজে ভাবি—বিপ্লব আসবেই আসবে কোনও দিন। প্রতি নির্বাচনে হেরে
যাওয়াটা অভ্যেস হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ছাপ পাল্টানোর কথা মনে আসে না। রোজ
সকালে আয়নায় দাঁড়াই। নিজেদের দিকে তাকিয়ে ভাবি—আজ না হোক কাল, না হলে পরশু
কিংবা তার পরের দিন অথবা আরও পরে, কিন্তু একদিন না একদিন ‘আজ’-এর পতন
আসবে। লেখা হবে ‘আগামী’। আমরাই লিখব সেই ‘আগামী’। নিজের মনে ঠাট্টা করে
বলি, ‘তখন দেখে নেব তোকে’। কী লাভ এ সব দিবাস্বপ্ন দেখে?
এতক্ষণ কী লিখলাম, এক বার ফিরে পড়লাম। প্রলাপ মনে হচ্ছে। হয়তো তাই।
লেখার প্রথম দিকে বলেছিলাম ‘বড় শহর’-এর কথা। সেই বড় শহরের অনেক গরিমা।
অনেক পয়সা। অনেক ঝাঁ-চকচকে উদাহরণ। কিন্তু আমাদের কলকাতার মতো এত মন খারাপ
তো দিতে পারে না তারা। তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ ঝলসে যায়, এত তাদের রং, এত
জৌলুস। কিন্তু চার টাকার চায়ের বিনিময়ে দু’ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার দোকান আর
কোথায় পাব, এই পোড়া কলকাতা ছাড়া? আমার শহর। পচা শহর। গরমের শহর। ধুলোর
শহর। অব্যবস্থার শহর। তবু আমার শহর। কলকাতা শহর। সংস্কৃতির শহর। মিছিলের
শহর। আড্ডার শহর। প্রতিবাদের শহর। রাজনীতির শহর। প্রেমের শহর। উন্মাদনার
শহর।
আবেগের শহর। আবেশের শহর। অকারণ সময় নষ্ট করার শহর। সে শহরে তেমন জৌলুস
নেই। সে শহরের বাতাসে টাকা ওড়ে না। অথচ সে শহরে কবিতায় উন্মত্ত হয়ে সব
বিকিয়ে দেওয়া সাজে। সে শহরে গানে মাতোয়ারা হয়ে দেউলিয়া হওয়া যায়। সে শহরে
একটি পয়সা না জুটলেও থিয়েটার করে যুগ পাল্টানোর অবাস্তব রোমান্টিসিজমে
আচ্ছন্ন হওয়া মানায়। বড় আবেগের, বড় বিরক্তির, বড় আদরের, বড় হতাশার, বড়
প্রিয় আমার কলকাতা। তোকে ছাড়া চলবে না।


No comments:
Post a Comment